♪ মায়ের এক নাল দুধের দাম কাটিয়া গায়েরও চাম(চামড়া) পাপোশ বানাইলে তা তো শোধ হবে না এমন ঋণ শোধ হবার নয় মা ও মা ♪ বাসার কাজের ছেলেটা আনমনে এই গান গাচ্ছিল। এই গান শুনে আমার মনে পড়ল যে কালকে তো বিশ্ব মা দিবস। মাকে কিছু একটা দিয়ে সারপ্রাইজ দিব দারুণ মজা হবে। তাই না! বাসা থেকে সন্ধ্যার সময় বের হচ্ছিলাম। তখনই এসব মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু হাতে তো কোন টাকা পয়সা নেই। মাকে বললে তো সব কিছু বুঝে ফেলবে। কেন লাগবে? কি করবি? শুধু শুধু টাকা দিয়ে তোর আজকালের পোলাপাইন কি যে করিস বুঝি না? যত সব ঘ্যাণ ঘ্যাণ! মাটির ব্যাংকটা ভেঙ্গে ফেললাম।বাসা থেকে বের হলাম। বাসে উঠলাম এবং বাস হতে নামলাম। কথাগুলো যত সহজে বললাম অত সোজা কিন্তু না। নানা ব্যস্ততা,ঝামেলা তো ছিলই। মাকে কি দেয়া যায়, কি দেয়া যায়?? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে লাইব্রেরীর সামনে এসে পড়লাম খেয়াল করলাম না। কোন কথাবার্তা ছাড়াই ঢুকে পড়লাম। অবশ্য কথা বলে কি হবে চিনিই তো না। ঢুকে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করলাম। কিছু একটা স্পেশাল যা মার পছন্দ হবে। কিন্তু এসবের গন্ধ পাচ্ছিলাম না। আমার এই অবস্থা দেখে লাইব্রেরিয়ান বলে উঠল, - "ভাইজান কি লাগবে?" হঠাৎ এ কথা শুনে যা করছিলাম তা বন্ধ করলাম। কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, - "কাল তো মা দিবস। মাকে কিছু দিতে চাই। কি দেয়া যায় বলেন তো? আমার মাথায় কিছুই আসছে না " উনি একটু মৃদু হাসলেন। আমি মনে মনে রাগান্বিত হলাম। - "মাকে আপনি বই, মুভির ডিভি, সোফিস, শাড়ি......মানে অনেককিছু দিতে পারেন। কিন্তু আপনার মাথায় রাখতে হবে যে তিনি কি পছন্দ করেন? সেটা আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেন এবং জানেন ভালো।" আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম । কি জানি পছন্দ করে? " মা নিয়ে নানা মুভি আছে পাশের দোকানে পাবেন। দেশে বিদেশে তো মা নিয়ে মুভি কম হল না। গেলেই দেখতে পাবেন। পুরানো দিনের কিছু মুভি পাবেন।যেমন: #অ্যালিস_ডাজ_নট_লিভ_হিয়ার_অ্যানি_মোর - 1974 #ফ্রিকি_ফাইডে - 1976 #টার্মস_অফ_এন্ডারমেন্ট - 1983 #মাস্ক - 1985 #স্টিল_ম্যাগনোলিস - 1989 #স্টপ_অর_মাই_মাম_উইল_শুট - 1992 #স্টেপমম - 1998 #এরিন_ব্রোকোভিচ - 2000 #চকোলেট - 2000 #ফ্রিকি_ফাইডে - 2003 এছাড়া আরও নানা ভাষার মুভি পাবেন।বাংলা,হিন্দিও কম হবে না। - "না মুভি আম্মু অতো দেখে না।তাকে বই ও একটা কার্ড দিলেই মনে হয় ভালো হবে।কি বলেন?" - "যা আপনি ভালো বুঝেন"। এমনভাবে বলল যেন তার কিছু একটা হয়েছে। প্রচুর ঘাটাঘাটি করা হল।কিছু কার্ড বের হয়ে এল। একটি কার্ড পছন্দও হল। কিন্তু ভিতরে কিছু লেখা নেই। - "আচ্ছা কার্ডের উপরে কি লেখা যায় বলেন তো??" আমার প্রশ্ন তিনি একটি বই বের করলেন যাতে মা নিয়ে নানা উক্তিতে ভরপুর।আমি মহাখুশিতে একটা যুতসই বাণী খুঁজতে লাগলাম- " দুঃখের_সায়রে_মায়ের_এক_সুখ_রঙিন_ঝিনুকে_পোরা_মুক্তা_এতটুক" - জসীম_উদ্দিন। আরো নানা লেখকের দেখলাম - সুরেন্দ্রনাথ_মজুমদার, গিরীন্দ্র_মোহিনী_দাসী, ইমারসন, রজনীকান্ত_সেন। শেষমেষ একটা লিখে দিলাম "স্নেহময়ী_মাতার_হাসিত_অধর_তার_চেয়ে_বেশী_কিছু_আছে_কি_সুন্দর?"" - আকরাম_হোসেন এসব লেখা পড়তে পড়তে আমার মাথা যখন ব্যস্ত ততক্ষনে তিনি কিছু বই বের করে আনলেন। কত শত যে বই নাম বলে শেষ করা যাবে না। কিছুর মধ্যে এত কিছু এতো অনেক কিছু। কিন্তু টাকার কথা মাথায় রেখে কিনতে হল - জননী, লেখক_শওকত_ওসমান। দাম নিয়ে কোন চিন্তা করতে হল না। পকেটে যা ছিল তাই দিয়েই হয়ে গেলো। ভাগ্যভাল কিছু টাকা বেঁচে গেল। লাইব্রেরি হতে বের হয়ে দেখি। যে রাস্তায় আর শুভ্র সন্ধ্যা নেই। আকাশ এখন রাতের চাদরে মুড়ানো যে জায়গা দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে কোনো যানবাহনই নেই। রাত তখন দশটা। চারদিক শুনশান। দূর হতে এক রিকশার বেল বাঁজানোর শব্দ শুনা গেল। কিছুটা আশ্বাস পেলাম।দেখলাম এক বয়স্ক চেহারা বুড়ো মানুষ। - "চাচা যাবেন?" - "কই যাবেন, ভাতিজা?" - "এই তো সামনে" - "ঠিক আছে উইঠা পড়েন" তিনি রিকশা চালানো শুরু করলেন। এক শীতল মাথা নষ্ট বাতাস বয়ে গেল। মুখ বন্ধ রাখতে ভালো লাগল না তাই মজা করার জন্য বললাম, - "চাচা কাল তো মা দিবস আপনি কি করবেন??" যা ভেবেছিলাম তাই উত্তর পেলাম। "গরীবের আবার দিবস ফিবস। পেট খালি থাকলে কোন কিছু মানে না বাপ" আমি সায় দিলাম। "তয় তুমি মা বলাতে একটা কাহিনী মনে পইড়া গেলো। আমার মা আমারে একদিন কইছিলো। প্রত্যেক ধর্মে আমরা মা দেখতে পাই। মা_আমেনা, মা_দূর্গা, মা_মেরী। আব্দুল কাদের জিলানী ও তাঁর মায়ের কথা তো জানোই। শুন বাপ আইজা তোরে এক দরদী মায়ের গল্প শুনামু। মায়ের_পুত্রের_জন্য_কলিজা_দান সে বহুত আগের কথা। এক মা ও পোলা আচ্ছিল। তাগো মাঝে আচ্ছিল বহুত স্নেহ-ভালোবাসা,মায়া-মমতা।তাগো এত স্নেহ-ভালোবাসা যে আশেপাশের মানুষ তা দেইখা হিংসা করত। তাগো সুখ বেশিদিন ঠিকল না কারণ এক রাক্ষসীর তা সহ্য হইল না। সে সুন্দর মেয়ের সুরত নিয়া তাগো ঘরে আইলো তার পোলারো বশ করলো একদিন পোলার কাছে আবদার করল "তোমার মা তোমারে কত্ত ভালোবাসে তোমার লাইগা সব করতে পারে কওনা তারে তার কলিজাটা তোমারে দিতে" এ কথা শুনে পোলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল । "কি কও এইসব?এইডা সম্ভব না। " "তাইলে আমি তোমারে ছাইড়া যাইতেছি তুমি তোমার মায়েরে নিয়া থাক" এ কথায় পোলা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক মোহের আবেশে তাড়িত হইল। রাক্ষসীর মায়া তার উপর কাজ করল। সে মায়ের কাছে গিয়া কইল, " মা তোর কইলজা টা দে তো একটু দেখি আমার লাইগা তোর কত মায়া।" মা এ কথা শুইনা আসমান হইতে পড়ইল। সে তার বুকের মানিকের কাছ থেকে একি শুনতে পাইল্ল। সে কাঁদিয়া বুক ভাসাইল।কহিল,"মানিক আমার তুই যখন চাইছস আমি তোরে দিমু বাজান" এই বলে মা তার পাশে থাকা ছুরি দিয়ে নিজের বুক কেঁটে কলিজাটা বের করে দিয়া দিল। সাথে সাথে মা তার মরিয়া গেল। পোলা কলিজা নিয়া দৌড়াইয়া রাক্ষসীর কাছে যাইতেছিল হঠাৎ করে একটা গাছের গুড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে পইড়া গেল। ঠিক তখনি কলিজা টা বইলা উঠল "বাপজান ব্যথা পাইছোস" এ কথা শুনে পোলার উপর রাক্ষসীর সব মায়া কাইটা গেল। সে আফসোস কইতে লাগল সে এটি কি করিসে। "ভাতিজা বুঝিছ মা কেমন জিনিস?" এমন গল্পের পর আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। পকেটে যা ছিল তা দিয়ে চাচাকে বিদায় করলাম। রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরে এলাম। বাসায় এসে দেখলাম মা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে তাকে শুভেচ্ছা জানাব ঠিক করলাম। নিজে রুমে যেতে যেতে ভাবতে লাগলাম। হায়!! হায়!! দুনিয়াতে এমন মাও আছে। মা জাতি আসলেই অনেক মহান। তারা সারা জীবন নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করে চলেছে। নেই কোনো চাওয়া, নেই কোন পাওয়া। তারা মহান,তারা অনন্ত,তারা অসীম। আমার মা, তোমার মা, আমাদের মা।