গল্পঃ কেউ দায়ী নয়
সময়ঃ ১৮ মে, ২০১৪
উৎসর্গ: পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় যারা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে

"অাত্মহত্যা মহাপাপ- এই নীতি এই মুহুর্তে কোন কাজের না। এত নীতি মানলে জীবন হয় না" - আরমান সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। বেশ কয়েকবার পায়চারি করল। কিন্তু এক ঘন্টা যাবত সে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। "এটা করা কি ঠিক হবে?? না!!! আমার এই অবস্থা দেখে বাবা সহ্য করতে পারলেও মা কিছুতেই পারবে না" মনে মনে বারংবার এই কথা বলছে ও ভাবছে আরমান। আরমানকে চিনতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সকালে। তখন সকাল দশটা বাজে প্রায়। প্রতিদিনের মত আজ সকালেও ঘুমাচ্ছিল আরমান। হঠাৎ তার মুঠোফোনে রিংটোন বেঁজে ওঠল। কল দিয়েছে তার বন্ধু তুহিন। - "দোস্ত তুই কই?? স্কুলে আসবি না রেজাল্ট দেখতে? " - " আমি তো বাসাতে" "কস কি মামা?? তাড়াতাড়ি স্কুলের সামনে আয়। এখনো তুই বাসায় বসে ঘুমাছ!! অন্তত আজকে একটু চেইঞ্জ হ" - "ঠিক আছে আমি আসতেছি শফিক কই??" - "ওর কথা আর বলিস না সে তো সেই সাত সকাল হতে বোর্ডের সামনে বসা তুই দেরি করিস না শীঘ্রই আয়" ফোনটা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল আরমান। না কয়েক ঘন্টা পর আবার কল এল। আবার কল দিয়েছে তুহিন তবে এই বার কন্ঠ কিছুটা বিষণ্ণ। - "দোস্ত তুই আসছ নাই ভালো হইছে। আর স্কুলে আসিস না বাসায় থাক আমরা অাসতেছি। তুই থাকিস কিন্তু" আরমান কিছু বলার আগেই ফোন কল কেটে গেল। সে কিছুটা বিস্মিত এবং অবাক। - "কি হতে পারে???" সে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে নিজের অজান্তে বলে উঠল,"না!" তার এস.এস.সি পরীক্ষার রেজাল্ট নিশ্চয়ই খারাপ হয়েছে। তাড়াতাড়ি করে মুঠোফোনে দিয়ে নিজের রোল নং এবং বোর্ডের নাম লিখে ম্যাসেজ পাঠাল। কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায় ফিরতি ম্যাসেজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। রিংটোন বেঁজে মোবাইলে একটি ম্যাসেজ আসল। দুরদুর বুকে সে হালকা মোবাইলের আলোতে ম্যাসেজ পড়া শুরু করল। প্রথমে নাম,রোল নং, রেজিস্ট্রেশন নং,বোর্ডের নাম, স্কুলের নাম, শেষে পেল রেজাল্ট। সে এ+ মিস করেছে। কেন হল এমন?? বাংলায় গেছে মানছি কিন্তু উচ্চতর গণিতে কেমনে গেল? পুরো মনটায় খারাপ হয়ে গেল। মাথায় তার আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সে নিজের শরীরে অদ্ভুত কিছু অনুভব করতে লাগল। মন কেমন যেন আজ নিস্তেজ এবং সংকাশ অনুভব করছে। আব্বু অফিসে আর আম্মু বাসায়। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। আম্মুকে রেজাল্টের কথা বলল না আরমান। বন্ধুরা আসবে জেনেও কাউকে কিছু না বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আজ তার পড়াশুনার এই হাল কেন হল?? তার কি পড়াশুনাতে কোন ঘাটতি ছিল?? সে কি কিছুটা উদাসীন ছিল?? আলসেমিই কি তার আজ এই পরিণতির কারণ?? দুই চোখ যে দিকে যায় সে দিকে সে চলে যাবে বলে মনস্থির করল। সে হাঁটতে হাঁটতে রেল স্টেশনে পৌঁছালো। গিয়েই কোন সাত-পাঁচ না ভেবে সোজা রেল লাইনের উপর শুয়ে পড়ল। স্টেশন মাস্টার তার গতিবিধি নজর করলেন। কিছুক্ষণ পর রেল লাইন কাঁপিয়ে রেল গাড়ি আসার শব্দ শোনা গেল। আরমান অটল থাকার চেষ্টা করল। তার এই জীবন রেখে কি লাভ?? হঠাৎ শুনতে পেল হাতে পতাকা ভর্তি এক লোকের নির্দেশ। - "এই ছেলে কি করছ? এটা ঘুমানোর জায়গা না বাপের লাইন পাইছোস নি? ওঠ বলতেছি। দেখতে তো ভাল ঘরের পোলা মনে হয়। এখানে করস কি?? ভাগ কইলাম এইখান থেইকা ।" কিছুটা অপ্রস্তুত, কিছুটা বিব্রত এবং কিছুটা বিরক্ত হয়ে বাধ্যছেলের মত লাইন থেকে উঠে এল। মাস্টার আবার দমক দিল। আরমান অনিচ্ছা সত্ত্বেও রেল স্টেশন ছেড়ে চলে এল। কিছুদূর গিয়ে এক মুদির দোকান দেখতে পেল। পকেটে হাত দিল বেরিয়ে এল বিশ টাকার এক পুরানো নোট। দেখেই বোঝা যায় নোটের অবস্থা খুব খারাপ ওর মত। কাছে গিয়ে বলে ফেলল, " মামা ইঁদুর মারার বিষ আছে??" দোকানদার,"হ মামা আছে। কয় বোতল লাগবো?" "দাম কত করে??" "বোতল পনের টাকা" "আচ্ছা এক বোতল দেন" আরমান সেই কুড়ি টাকার নোট বের করে দিল দোকানদার তাকে বিনিময়ে হাতে দিল এক বোতল ইঁদুর মারার বিষাক্ত বিষ। বোতল পেয়ে অজানা উদ্দেশ্যে সে চলতে লাগল। গিয়ে পৌঁছালো এক পার্কে। পার্কে গিয়ে দেখে আজে বাজে মানুষজনে ভর্তি। এসব দেখে তার কোন কাজ নেই। নিজ কাজে মন দিল। বোতল খোলার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। বহু চেষ্টা শেষেও যখন ব্যর্থ তখন বোতলের ছিপি মারল টান। সাথে সাথে ছিপি কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল। এক ঠোকাই সেটা কুড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। কেউ একজন সেটা লক্ষ্য করল। বোতল হতে এক বিশ্রী গন্ধ আসতে লাগল। "কি গন্ধ রে বাবা? কেমনে খাব?? না আমাকে যে খেতেই হবে।" আর না ভেবে যা হবে হোক বলে নাক চেপে ঢকঢক করে পুরো বোতল শেষ করার ব্যর্থ প্রয়াস চালাল। কিন্তু অর্ধেকের বেশি খেতে পারল না। যা হবে হোক মনে হয় বিষক্রিয়া কাজ করা শুরু করেছে পেট ও গলায় কেমন যেন অনুভব করতে লাগল?? মাথাটা কিছুটা নেশা করার মত ঘুরাতে লাগল। অনিচ্ছুভাবে ঘুমিয়ে পড়ল। এক ঘন্টা পর তার ঘুম ভাঙ্গল। নিজেকে এক অজানা জগতে অাবিষ্কার করল। চারদিকে জোড়া জোড়া চড়ুইপাখির দল। তারা মেতেছে প্রেমালাপে। দেখা যাচ্ছে বাদাম, চানাচুর খাওয়ার দৃশ্য। কিছুটা অবাক হয়ে মনে মনে ভাবল সে না বিষ খেয়েছিল?? কি হল এই বিষের?? সেটাও প্রতারণা করল!! এই পরিকল্পনা ফেল হল দেখে নতুন ভাবনার চেষ্টা করল। গলায় ফাঁস দিলে কেমন হয়? না! জনসমক্ষে তা সম্ভব না। গলায় ফাঁস দেয়ার চিন্তা বাদ দিল। বাসায় ফেরত আসল। উঠে গেল ছাদে। হ্যাঁ এতক্ষণ পর মনে হয় সে তার মনসই জায়গা পেল। গল্পের শুরু এখান থেকেই হয়েছিল। অবশেষে আরমান তার জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। সে ছাদ হতে লাফ দিবে। একটি ছোট্ট চিরকুট লিখল " আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি যাচ্ছি। না ফেরার সে দেশে!" তার মনে পড়ল সে হাইটোফোবিয়ার রোগী। কিছু করার নেই চোখ বন্ধ করে। এক পা.. দুই পা.. তিন পা .. করে এগিয়ে গেল। কানে ভেসে এল, "খোকা এই কাজ করিস না। তোর রেজাল্ট আমাদের কাছে কিছুই না। ফিরে দেখ একবার। চোখে দেখ আমার। " কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে পা ফসকে পড়ে গেল আরমান নামক সে। পরের দিন খবরের কাগজে ছাপা হল: ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা